টেকনাফে পাহাড় কেন্দ্রিক সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব: প্রাণভয়ে গ্রাম ছাড়ছে শতশত পরিবার, আতঙ্কে জনপ্রতিনিধিরাও

টেকনাফ প্রতিনিধি: দিন-রাত থমথমে পরিবেশ, ভেসে আসছে অবিরাম গুলির শব্দ। টেকনাফের পাহাড়ঘেরা বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী জনপদে এখন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি থমকে গেছে। একের পর এক অপহরণ, চাঁদা দাবি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তৈরি হয়েছে চরম নিরাপত্তাহীনতা। জীবন বাঁচাতে ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, এমনকি আতঙ্কে রয়েছেন জনপ্রতিনিধিরাও।

কেন ভিটেমাটি ছাড়ছেন মানুষ?

পাহাড় থেকে নেমে আসা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অত্যাচার আর অপহরণ আতঙ্কে পুরো এলাকা এখন ভূতুড়ে পরিবেশ ধারণ করেছে।

  • ঘরবাড়িতে তালা: পাহাড়ঘেঁষা দুই গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার ইতোমধ্যে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা ভাড়া বাসায় চলে গেছেন।

  • রাতে ঘর শূন্য: অনেক পুরুষ দিনে এসে ঘরবাড়ি পাহারা দিলেও সন্ধ্যার আগেই পরিবারকে দূরে রেখে অন্যত্র রাত কাটাচ্ছেন।

  • জীবনযাত্রার বিপর্যয়: শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ সার্বিক জনপদের মানুষ এখন দিন গুনছেন চরম অনিশ্চয়তায়।

এক ভুক্তভোগীর আকুতি:

“পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে স্ত্রী-সন্তানদের শহরের ভাড়া বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি। দিনে একা ঘর পাহারা দিই, আর রাত হলে আতঙ্কে অন্য জায়গায় গিয়ে থাকি। নিজ ঘরেই আজ আমরা পরবাসী।” — মোহাম্মদ শাকের, স্থানীয় বাসিন্দা

সাম্প্রতিক অপহরণ ও সহিংসতার চিত্র

বিগত কিছুদিন ধরে পাহাড়ভিত্তিক এই অপরাধ চক্রটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে:

  • ১৭ জুলাই: উত্তর নয়াপাড়ার পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মো. আরাফাত (১২) নামের এক শিশুকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। পরে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনে পরিবার।

  • ২৮ জুন: নোয়াখালী জুম্মাপাড়ায় বাড়িতে ঢুকে পল্লী চিকিৎসক কামাল উদ্দিনকে (৬৫) অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান মেলেনি।

  • সহিংসতা ও লাশ উদ্ধার: ৩ মে অপহরণের চেষ্টাকালে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন, এপ্রিলে নিহত হন এক তরুণী। এ ছাড়া পাহাড় ও তার আশপাশ থেকে বস্তাবন্দি খণ্ডিত ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।

৩ বছরে ৩২০ জন অপহরণ

স্থানীয় ও পুলিশের তথ্যমতে, গত ৩ বছরে টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ঘেঁষা এলাকা থেকে প্রায় ৩২০ জন অপহৃত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু গত এক বছরেই ১৫টি ঘটনায় ১৫৫ জন অপহৃত হন, যার একটি বড় অংশ (৯৬ জন) রোহিঙ্গা নাগরিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণের বিনিময়ে বাড়ি ফিরেছেন ভুক্তভোগীরা।

আতঙ্কে জনপ্রতিনিধিরাও

পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক যে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। বাহারছড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছ জানান, তার এলাকা থেকে ইতিমধ্যে ৩০-৪০টি পরিবার এলাকা ছেড়েছে। তিনি নিজেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এবং বিকল্প জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার চিন্তা করছেন।

প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের পদক্ষেপ

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথ বাহিনীর অভিযানের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধি ও প্রশাসন:

  • শাহজাহান চৌধুরী (সংসদ সদস্য, উখিয়া-টেকনাফ): অপরাধ দমনে শিগগিরই বিশেষ বাহিনীর অভিযান শুরু হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পুলিশ চৌকি বসানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

  • আমজাদ হোসেন খোকন (ইউপি চেয়ারম্যান, বাহারছড়া): দ্রুত যৌথ বাহিনীর জোরদার অভিযান ছাড়া এই জনপদকে স্বাভাবিক করা অসম্ভব।

  • মো. সাইফুর রহমান (ওসি, টেকনাফ মডেল থানা): যৌথ অভিযান শিগগিরই শুরু হবে। এলাকাটিকে নিরাপদ করতে পুলিশের টহল টিম ইতিমধ্যে জোরদার করা হয়েছে।

  • এস এম অনীক চৌধুরী (ইউএনও, টেকনাফ): সন্ত্রাসীদের দমনে বড় পরিসরে যৌথ অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পাহাড়ঘেঁষা জনপদটিকে পুরোপুরি জনশূন্য হওয়া থেকে বাঁচাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ দাবি করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

পূর্বের খবরগাজায় ইসরায়েলি তাণ্ডব: বোমার আঘাতে গর্ভপাত, প্রাণ গেল মা-শিশুসহ একই পরিবারের ৩ জনের
পরবর্তি খবরএক আইনেই ভ্যাট আদায়ে চরম ধস: ইতিহাসে প্রথম মাসে রেকর্ড ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি