অনলাইন ডেস্ক: ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে গিয়ে উল্টো বড় ধরনের রাজস্ব সংকটে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রতি মাসের বদলে তিন মাস পর পর (ত্রৈমাসিক) ভ্যাট রিটার্ন জমার নতুন নিয়ম চালু করা হয়। কোনো পূর্ব যাচাই-বাছাই ছাড়া নেওয়া এই সিদ্ধান্ত রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
এনবিআরের ইতিহাসে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই ভ্যাট আদায়ে রেকর্ড ঋণাত্মক (মাইনাস) প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। টানা দুই অঙ্কের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে থাকা ভ্যাট খাত থেকে রাজস্ব আদায় কমে গেছে প্রায় ২৬.৪৯ শতাংশ।
লক্ষ্যের চেয়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি
অর্থবছরের প্রথম মাসেই আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট—তিন খাতেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছে এনবিআর:
-
সামগ্রিক রাজস্ব ঘাটতি: অর্থবছরের প্রথম মাসে ৩৮,৮৮০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ২৩,৮২৫ কোটি টাকা। ফলে শুরুতেই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫,০৫৫ কোটি টাকা (সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি মাইনাস ১২.৮৮%)।
-
ভ্যাট খাতেই বড় ধাক্কা: ১৫,৮৭৬ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগৃহীত হয়েছে মাত্র ৮,৩৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ কেবল ভ্যাটের ঘাটতিই ৭,৫২০ কোটি টাকা।
-
শুল্ক ও আয়কর: শুল্ক-কর খাতে ঘাটতি ৫,২৮৯ কোটি টাকা (মাইনাস ১১.২০%) এবং আয়কর খাতেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২,২৪৫ কোটি টাকায়।
বিপর্যয়ের নেপথ্যে যেসব মূল কারণ
১. অর্থ আটকে রাখার প্রবণতা:
ভ্যাট নীতি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুর রউফ জানান, তিন মাস পর ভ্যাট দেওয়ার সুযোগ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী সেই টাকা অন্য খাতে খাটিয়ে ফেলছেন। ফলে শেষ সময়ে একসাথে বড় অঙ্কের ভ্যাট পরিশোধ করতে গিয়ে তারা সমস্যায় পড়বেন।
২. ভোক্তা দিল টাকা, পেল না সরকার:
সাধারণ ক্রেতা পণ্য কেনার সাথে সাথে ট্যাক্স বা ভ্যাট বুঝিয়ে দিলেও সরকার তিন মাস সেই টাকা পাচ্ছে না। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবসায়ীদের কাছে বিনামূল্যে আটকে থাকছে, যার ফলে তাৎক্ষণিক খরচ চালাতে সরকারকে ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হতে পারে।
৩. রেয়াত হিসাব ও ট্র্যাকিং জটিলতা:
প্রতি মাসে রেয়াত না নিয়ে তিন মাস পর হিসাব মেলাতে গিয়ে সাপ্লাই চেইনের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জটিলতা ও বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে।
৪. প্রশাসনিক অডিট জট:
প্রতি মাসের তথ্য প্রতি মাসে যাচাই না করে তিন মাসের বিপুল পরিমাণ ট্রানজেকশন একসাথে অডিট করা ভ্যাট সার্কেল অফিসগুলোর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা বকেয়া ও মামলা জট বাড়াবে।
মাঠ পর্যায় ও এনবিআরের বক্তব্য
এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়ন বিভাগের সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমান জানান, ত্রৈমাসিক রিটার্নের কারণেই মূলত প্রাথমিক ধাক্কাটি এসেছে, তবে সার্বিক পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে অন্তত অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এই নিয়মের ওপর একটি বিশদ ‘ওয়ার্কিং পেপার’ আহ্বান করেছেন। একই সাথে এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের তদারকিতে দুর্বলতা ও প্রশাসনের সাবেক সিন্ডিকেটের কারণেও রাজস্ব আহরণের এই গতি থমকে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।












































