নৌভাড়ার চেয়ে টোল বেশি: মহেশখালী ঘাটে প্রকাশ্য ‘পকেট কাটা’র শিকার পর্যটকেরা!

অনলাইন ডেস্ক –

আসা-যাওয়ায় ভাড়া ৬০ টাকা, কিন্তু টোল ১০০! প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে হুমকির মুখে দ্বীপের পর্যটন শিল্প

​সমুদ্র, পাহাড়, আদিনাথ মন্দির আর রাখাইন সংস্কৃতির অনন্য তীর্থভূমি মহেশখালী। কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের জন্য এটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলেও, বর্তমানে মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথের চরম অব্যবস্থাপনা ও অতিরিক্ত খরচের কারণে পর্যটকদের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। অভিযোগ উঠেছে, ঘাটে প্রবেশ ও বের হওয়ার নামেই যাত্রীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা, যা প্রকারান্তরে পর্যটন বিকাশের টুঁটি চেপে ধরার শামিল।

​ভাড়ার চেয়ে টোল বেশি: এক অভিনব জুলুম

​বিআইডব্লিউটিএ নির্ধারিত সি-ট্রাকের ভাড়া যেখানে মাত্র  ৩০ টাকা এবং গামবোটের ভাড়া ৩০ টাকা, সেখানে আসা-যাওয়ার পথে ঘাটে প্রবেশের জন্যই যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ১০০ টাকা টোল! অর্থাৎ, মূল নৌভাড়ার চেয়েও ঘাট টোলের নামে বেশি টাকা পকেট থেকে খসানো হচ্ছে।

​একক যাত্রীর জন্য এটি বাড়তি চাপ হলেও, পরিবার বা দলগত পর্যটকদের জন্য এটি রীতিমতো পকেট কাটার নামান্তর। ৪ জনের একটি পরিবারকে শুধু ঘাটে পা রাখার জন্যই দিতে হচ্ছে ৪০০ টাকা। এর সাথে নৌযান ভাড়া, অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ যোগ হয়ে মধ্যবিত্তের জন্য মহেশখালী ভ্রমণ এখন বিলাসবহুল ও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই লাগামহীন খরচ দীর্ঘমেয়াদে পর্যটকদের এই দ্বীপ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করবে।

​সেবার নামে শূন্য, টোলের নামে কেন এই চাঁদাবাজি?

​সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যাত্রীদের পকেট খালি করে যে বিপুল পরিমাণ টোল আদায় করা হচ্ছে, তার বিনিময়ে ঘাটে কী সেবা দেওয়া হচ্ছে?

  • ​ঘাটে কি ন্যূনতম বসার ব্যবস্থা আছে? না।
  • ​নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য কোনো পরিচ্ছন্ন অপেক্ষাগার বা শৌচাগার আছে? না।
  • ​পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা কিংবা শৃঙ্খলা আছে? তাও না।

​কোনো ধরনের নাগরিক সুবিধা না বাড়িয়ে এভাবে টাকা আদায় করা স্পষ্টতই অন্যায়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ৫০ টাকা করে টোল আদায়ের কোনো বৈধ আইনি ভিত্তি বা সরকারি অনুমোদন আছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি আদায়ের বিপরীতে রসিদ দেওয়ার কথা থাকলেও, তা মানা হচ্ছে না। ফলে এই বিপুল অর্থ কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সন্দেহ দানা বেঁধেছে।

​ধ্বংসের মুখে স্থানীয় অর্থনীতি

​মহেশখালীর অর্থনীতি অনেকাংশে পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। ঘাটের এই অরাজকতার কারণে যদি পর্যটক আসা কমে যায়, তবে তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে স্থানীয় চালক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, রাখাইন হস্তশিল্প শিল্পী এবং পান ও লবণ চাষিদের ওপর। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের লোভের খেসারত দিতে হবে গোটা দ্বীপের সাধারণ মানুষকে।

​প্রতিকারে প্রশাসনের কাছে কঠোর দাবি

​মহেশখালীর পর্যটন সম্ভাবনাকে বাঁচাতে হলে প্রশাসনকে এখনই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে:

​১. টোলের আইনি ভিত্তি প্রকাশ: এই টোলের অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ কে এবং ভাড়ার হার কত, তা অবিলম্বে নথিপত্রসহ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। অনুমোদনের বাইরে এক টাকাও বেশি নিলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

২. দৃশ্যমান মূল্য তালিকা: ঘাটের প্রবেশমুখে বড় বড় অক্ষরে “নৌযান ভাড়া” এবং “অনুমোদিত ঘাট টোল” এর তালিকা টাঙাতে হবে।

৩. বাধ্যতামূলক রসিদ: রসিদ ছাড়া যেকোনো ধরনের অর্থ আদায়কে ‘অবৈধ চাঁদাবাজি’ হিসেবে গণ্য করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

৪. নিয়মিত ম্যাজিস্ট্রেট টহল: ঘাটের সিন্ডিকেট ও হয়রানি ভাঙতে স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত আকস্মিক অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে।

৫. সরকারি সেবার সুরক্ষা: সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে সি-ট্রাক সার্ভিসকে নিয়মিত ও সিন্ডিকেটমুক্ত রাখতে হবে।

​পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হলে পর্যটকদের শোষণ করা বন্ধ করতে হবে। মহেশখালীকে পর্যটনবান্ধব করতে হলে অবিলম্বে এই ঘাট-সন্ত্রাস ও অতিরিক্ত টোলের নৈরাজ্য বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

পূর্বের খবরগ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে কক্সবাজারে ১১ দলের স্মারকলিপি