বিশেষ প্রতিবেদন: হাত বদলালেই অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম। কৃষক বা খামারিদের উৎপাদন খরচ উঠাতে যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন), অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব এবং উচ্চ লজিস্টিক খরচের কারণে ভোক্তাপর্যায়ে গিয়ে সেই পণ্যের দাম দ্বিগুণ বা তারও বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের শৃঙ্খল: বাজার, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক গবেষণায় এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
হাতবদলেই লাফিয়ে বাড়ে নিত্যপণ্যের দাম
সিপিডির ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের (চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচা মরিচ, বেগুন, ডিম, গরুর মাংস, রুই মাছ ও ব্রয়লার মুরগি) ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে—পণ্যভেদে দাম বৃদ্ধির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে বাজার শৃঙ্খলের একেকটি নির্দিষ্ট ধাপ:
-
চাল (মিলারদের দাপট): কৃষক পর্যায়ে পাইজাম ধানের দর গড়ে ৩০.৬৫ টাকা হলে ব্যাপারী, মিলার ও আড়তদার ঘুরে খুচরা বাজারে তা দাঁড়ায় ৫৯.৬৯ টাকায়। এর মধ্যে চালের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ে মিলারদের হাতে। প্রতি কেজি ধানের প্রক্রিয়াজাতকরণেই দাম বাড়ে প্রায় ১৯ টাকা।
-
কাঁচা মরিচ ও মাছ: সবচেয়ে লম্বা সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে কাঁচা মরিচের দাম উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায়ে বাড়ে ১১৬%। রুই মাছের ক্ষেত্রে দাম বাড়ে ৭২%।
-
আলু ও মসুর ডাল: হিমাগার ব্যবস্থার অদক্ষতায় আলুর দাম বাড়ে, আর মসুর ডালের দাম বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে পাইকারি পর্যায়ের একচেটিয়া প্রভাব।
-
মাংস ও ডিম: গরুর মাংস ও ডিমের ক্ষেত্রে দাম বাড়ার মূল কারণ উচ্চ উৎপাদন খরচ (পোলট্রি ফিড ও ভ্যাকসিন)। প্রান্তিক খামারিরা প্রায়শই লোকসানে থাকেন।
মূল্যস্ফীতিতে জনজীবন অতিষ্ঠ: আয়ের ৬০% খাদ্যে
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থমকে দিয়েছে। দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যয় করছে শুধুমাত্র খাবারের পেছনে।
প্রকৃত আয় না বাড়ায় খাদ্য কিনতে গিয়েই নিঃশেষ হচ্ছে সঞ্চয়। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে সংকটে পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে।
লজিস্টিক ব্যয় স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে অনেক বেশি
রাজধানীর ব্র্যাক মিলনায়তনে আয়োজিত সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়কে দায়ী করেন।
“আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী বিশ্বে গড়ে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয় ধরা হলেও বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ। অবকাঠামোগত জটিলতা, সঠিক তথ্যের অভাব এবং সড়কে জায়গায় জায়গায় অপ্রাতিষ্ঠানিক (চাঁদাবাজি ও বাড়তি) খরচের কারণেই ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে যায়।”
— খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, মন্ত্রী, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়।
বাজার নিয়ন্ত্রণে দরকার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার
সিপিডির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, শুধুমাত্র খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার:
১. ডাইরেক্ট ফার্মার-টু-কনজিউমার (কৃষক থেকে সরাসরি ভোক্তা) বাজার ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
২. হিমাগার ও লজিস্টিক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ।
৩. মিলার ও পাইকারি পর্যায়ের কার্টেল বা সিন্ডিকেট ভাঙতে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ।
৪. পরিবহন খাতে হিসাববহির্ভূত খরচ ও চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর নজরদারি।














































