ভিআইপি স্টিকার ও বিলাসবহুল গাড়ির আড়ালে ইয়াবা কারবার, নেপথ্যে কারা?

বিশেষ প্রতিবেদন: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশি এড়াতে এবার নিত্যনতুন ও চমকপ্রদ পথ বেছে নিয়েছে মাদক কারবারিরা। আগে সাধারণ পরিবহন বা পায়ে হেঁটে সীমান্ত পার হলেও, এখন ইয়াবা পাচারের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে ভিআইপিদের ব্যবহৃত বিলাসবহুল গাড়ি, ভুয়া প্রাতিষ্ঠানিক স্টিকার এবং অভিনব সব যান্ত্রিক গোপন চেম্বার।

জুলাই মাসজুড়ে কক্সবাজার, রামু ও উখিয়ার বিভিন্ন তল্লাশি চৌকিতে অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব চাঞ্চল্যকর তথ্যের সত্যতা পেয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে ধুলো দিতে অভিনব কৌশল

বিজিবি, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) যৌথ তথ্যানুযায়ী, পাচারকারীরা রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ও মর্যাদাপূর্ণ পেশার পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। সড়কপথে ইয়াবার চালান পৌঁছে দিতে তারা যেসব মাধ্যম ব্যবহার করছে:

  • ভিআইপি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্টিকার: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনী, মিরপুর ডিওএইচএস, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমের ‘প্রেস’ স্টিকার ও লোগো।

  • বিলাসবহুল যানবাহন: হ্যারিয়ার, প্রাডো, ল্যান্ড ক্রুজার, নোয়া ও এসইউভি প্রাইভেটকার।

  • গোপন প্রযুক্তিগত চেম্বার: সাধারণ চোখ বা ম্যানুয়াল তল্লাশিতে ধরা না পড়ার জন্য গাড়ির এসি প্যানেল, এঞ্জিনের ভেতরের খালি অংশ, সিটের নিচের ফাঁকা জায়গা কিংবা গ্যাস সিলিন্ডার কেটে তৈরি করা বিশেষ ডার্ক চেম্বার।

  • ছদ্মবেশের ব্যবহার: পর্যটক, নারী ও শিশু এবং বিচারক কিংবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় প্রদান।

জুলাই মাসের কয়েকটি আলোচিত অভিযান

১. বাস টার্মিনাল এলাকা, কক্সবাজার: সেনাবাহিনী লেখা স্টিকারযুক্ত বিলাসবহুল ল্যান্ড ক্রুজার গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে সিটের নিচে বিশেষভাবে লুকানো ২৮ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় প্রাক্তন সেনাসদস্য ওবায়দুল হাসানকে। ২. হোয়াইক্যং বিজিবি চেকপোস্ট: একটি বিলাসবহুল প্রাইভেটকার থেকে জব্দ করা হয় ১ লাখ ৬ হাজার পিস ইয়াবার বিশাল চালান। গ্রেফতার হন সাইফুল ইসলাম খোকন। ৩. রামু ও শীলখালী চেকপোস্ট: গ্যাস সিলিন্ডার কেটে গোপন রুম বানিয়ে ৩০ হাজার এবং ইঞ্জিনের পাশের গোপন স্থান থেকে ১০ হাজার ৬৮৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ৪. রাবারের বাগান এলাকা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ডিওএইচএস-এর স্টিকার লাগানো প্রাইভেটকার থেকে পর্যটকের ছদ্মবেশে থাকা দুই নারীসহ ৩ জনকে ৬ হাজার ইয়াবাসহ আটক করা হয়।

পরীক্ষার মুখে চেকপোস্টের নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ঘাটতি

পুলিশের মতে, যেকোনো কম্পিউটারের দোকান থেকে মাত্র কয়েক টাকায় এসব রাষ্ট্রীয় লোগো ও ভিআইপি স্টিকার হুবহু প্রিন্ট করা সম্ভব। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোনো ব্যক্তি বা গাড়ি সত্যিই সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করার মতো ডিজিটাল ডাটাবেজ বা আধুনিক স্ক্যানার ব্যবস্থা মহাসড়কের চেকপোস্টগুলোতে নেই। ফলে এই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা।

আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বশীলদের বক্তব্য

“রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচয় চিহ্ন ব্যবহার করে মাদক পাচারের চেষ্টা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এর নেপথ্যে কোনো বড় সিন্ডিকেট বা অর্থদাতা জড়িত রয়েছে কি না, তা তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।”

শেখ মোহাম্মদ আলী, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), কক্সবাজার সদর মডেল থানা।

“ভিআইপি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টিকার ব্যবহার করে মাদক পরিবহন উদ্বেগজনক। এখন থেকে স্টিকারযুক্ত গাড়ি হলেও সন্দেহজনক মনে হলেই কঠোর তল্লাশির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

সোমেন মণ্ডল, উপপরিচালক, ডিএনসি কক্সবাজার।

“সীমান্ত এলাকায় ইয়াবা পাচার ঠেকাতে বিজিবি নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। সন্দেহভাজন বিলাসবহুল যানবাহনের ওপর বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকবে।”

লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম, অধিনায়ক, ৬৪ বিজিবি।

কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও শাস্তির বিধান

আইনজীবীদের মতে, ভুয়া স্টিকার ও যান্ত্রিক পরিবর্তন এনে মাদক বহনের অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে:

  • মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮: ১০ হাজার পিসের বেশি (বাণিজ্যিক পরিমাণ) ইয়াবা বহনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান।

  • দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ৪১৯/৪২০/৪৬৮): ভুয়া পরিচয়, রূপ ধারণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতীক জালিয়াতির অপরাধে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড

  • সম্পদ বাজেয়াপ্ত: অপরাধে ব্যবহৃত কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়িটি স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

পূর্বের খবরমহেশখালীতে স্বামী-শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনে গৃহবধূর মৃত্যু: মোবাইল ও বাজার করা নিয়ে কলহের জেরে হত্যাকাণ্ড!
পরবর্তি খবরকৃষক পায় ৩০, ভোক্তা দেয় ৬০: সিন্ডিকেট ও দীর্ঘ শৃঙ্খলে পিষ্ট বাজার