‘আগুনের খবর পাইয়াই দৌড়ায় আইছি। আইসা দেখি ধোঁয়া আর ধোঁয়া। কিছুই বের করতে পরিনি। আমার সব শেষ। দেড় মাস আগে ঢাকা ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকার লোন নিছি। ১৫ রোজায় ৯ লাখ টাকার মাল তুলছি। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ব্যাংকতো আর আগুন দেখবো না, টেকা না দিলে বাইন্দ্যা লইয়া যাইবো। এখন কি করবো? দুইটা দোকান ছিল। মা এন্টারপ্রাইজ ও বিস্মিল্লাহ্ এন্টারপ্রাইজ।
দোতলায় দোকান নং ২৬৫/৭ ও ২৬৩/৫। দুইটা দোকানই পুড়ে গেছে। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার মালামাল ছিল। ক্যাশে ছিল ৬০ হাজার টাকা। কিছুই নেই, পুড়ে শেষ। কান্না চেপে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন নিউ সুপার মার্কেটের দোকানি নাসিমা চৌধুরী। তিনি বলেন, ভেতরে ঢুকতে গেছিলাম, পুলিশ বের করে দিছে। ঢুকতে পারলে কিছু বের করতে পারতাম। নাসিমার মতো আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আরও শতাধিক ব্যবসায়ী। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে মার্কেটের গোডাউন ভর্তি কাপড় তোলা হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সব শেষ। নিউ সুপার মার্কেটের দোকানের মালামাল পোড়ার পাশাপাশি পানি, ধোঁয়া ও ময়লায় নষ্ট হয়েছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। নিউ সুপার মার্কেটের নিচ তলার চাদর ব্যবসায়ী রহম উল্যাহ বলেন, সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে দেখে মন মানছিল না, তাই দৌড়ে ভিতরে ঢুকেছিলাম। ভেতরে গিয়ে দেখি, শুধু ধোঁয়া আর পানি। হাঁটু পানি জমে গেছে। এ মিনিটও টিকতে পারিনি। এক পলকে দেখলাম, দোকানের সব মাল ভিজে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সব লাঠি দিয়ে টেনে বের করছে। দৌড়ে বের হয়ে আসছি। আমার দোকানে সব বিদেশি চাদর ছিল। শীত যাওয়ার পরে ২০ লাখ টাকার চাদর গোডাউন করছিলাম। সব নষ্ট হয়ে গেছে। পানিতে ভিজে দলা হয়ে আছে। এই দোকানই আমার সব। জীবনের সব সঞ্চয় এখানে। ২ ঘণ্টায় শেষ। এখন আমাকে পথে বসতে হবে। তিনি বলছিলেন, উপরে আগুনে সব পুড়ে গেছে। নিচে না পুড়লেও যা আছে তা আর ব্যবহার করা যাবে না। ধোঁয়া আর পানিতে সব মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতি সমানই হয়েছে।
মার্কেটের দোতলায় মো. হামিদ, মঈনুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলাম নামের তিন ভাইয়ের মেঘ দৃষ্টি গার্মেন্টস ও জাক্কাস ফ্যাশন নামে দু’টি দোকান ছিল। সেখানে ৫০ লাখ টাকার মতো মালামাল ছিল। তার মধ্যে এক দুই লাখ টাকার মালামাল নামাতে পেরেছেন তারা। চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনের রাস্তায় সেসব মালামাল এনে রেখেছেন তারা। মালামালকে ঘিরে এই তিন ভাই, তাদের স্ত্রী, সন্তান ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের কেউ কাঁদছিলেন, কেউ নির্বাক হয়ে ছিলেন। মো. হামিদ বলেন, গতকাল রাতেও ২০ লাখ টাকার মালামাল তুলেছি। পাইকাররা এসে দিয়ে গেছে। এই সময় কেউ বাকি দেয় না, নগদ টাকায় কিনেছি। হামিদ বলেন, চাবি দেখাইলে আমাকে ঢুকতে দেয়। প্রথমবার দোকানে ঢোকার পর ধোঁয়ার কারণে বের হয়ে যাই। পরে আবার ঢুকি। দেখি, সব মাল পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। আমাগো মাল পুড়ে নাই। পানিতে, ধোঁয়ায় আর ময়লায় মালগুলো শেষ। কিছু মালামাল শুকনা পাইছি। সেগুলো লইয়া আইছি।
বিধান সরকার নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, দ্বিতীয় তলায় একবারে শেষ মাথায় আমার দোকান ছিল। দোকানে শীতের জ্যাকেট ও তুলার তৈরি গরম কাপড় রাখা ছিল। আগুনে না পুড়লেও পানির ছাটে নষ্ট হয়ে গেছে। এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তারপরও কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে সবগুলো বের করার চেষ্টা করছি। কীভাবে এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠব তা বুঝতে পারছি না।
সরেজমিন গিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিউ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। সেহ্রির পরেই আগুন লাগে। সকাল হওয়ার আগেই আগুনে ভস্মীভূত হয় তৃতীয় তলার সব দোকান। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে দ্বিতীয় তলায়ও। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টার পরেও ১১টা পর্যন্ত দ্বিতীয় তলাও আগুনে পুড়ে যায়। এদিকে দুই তলা মিলে ২৫০টি দোকান পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সভাপতি হেলাল উদ্দিন। তিনি জানান, এ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ একশ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এদিকে নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন জানান, আগুনে প্রায় ২০ বন্ধুপ্রতিম দোকান পুড়ে গেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি দোকানে ২০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার মালামাল ছিল। তবে মার্কেটের প্রথম তলা রক্ষা করতে পেরেছে ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু অতিরিক্ত পানি ও ধোঁয়ায় প্রথম তলার প্রায় সব মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ব্যবসায়ীরা মার্কেটের ভেতরে ঢুকে দেখছেন সব শেষ। যে কাপড়গুলো পোড়েনি সেগুলোও নষ্ট হয়েছে পানিতে ভিজে। দুপুরেও মার্কেট থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ দোকানে ঢুকে কাগজপত্র, টাকাপয়সা যা পাচ্ছেন বস্তায় ভরে বের করছেন। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
মার্কেটের তৃতীয় তলার সুলতান ফ্যাশনের মালিক মো. মাসুম মিয়া বলেন, প্রথম রোজা থেকে এই পর্যন্ত প্রায় ২৭ লাখ টাকার মাল তুলেছি। সব পুড়ে গেছে। কেউ কেউ অল্প স্বল্প বের করতে পারছে। কিন্তু আমি কিছুই বের করতে পারিনি। ক্যাশে তিন দিনের বেচাকেনা করা ৬ লাখ টাকা ছিল। মালের সাথে টাকাও পুড়ে গেছে। বের করতে পরিনি। আমি এখন নিঃস্ব। তিন মাইয়া একটা ছেলে, আমি এখন কী কইরা খামু। আমার প্রায় ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার এখানে তিনটা দোকান ছিল। এক দোকানের মালামাল বের করতে পারলেও অন্য দুই দোকান পুড়ে গেছে। দুই দোকানে মালামাল ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা। আমার মতো অনেকেই মালামাল বের করতে পারে নাই। তাদের ক্ষতি হইছে আরও বেশি।












































