আমিনুল হক তুষার
কক্সবাজার জেলার অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের তীরে এক বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলে হওয়ায় প্রায়শই এই জেলায় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। প্রতি বছরই এ সকল ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বড় মাপের কৃষিজ ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানির জন্য দায়ী। যখন এই অঞ্চলে কোনো ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, তখন বঙ্গোপসাগরের উপকূলে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জলোচ্ছ্বাসের শিকার হয়, এবং তাদের জীবন ও জীবিকা ব্যাপকভাবে হয় ক্ষতিগ্রস্থ।
সরকারি হিসেব অনুসারে, ১৯৬৫ সাল হতে অদ্যাবধি বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৭০ টি বড় ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয়েছে, আর এ সকল ঘূর্ণিঝড়ের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং কয়েক বিলিয়ন ডলার সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুধু কক্সবাজার জেলার ঘূর্ণিঝড়ের ইতিহাস (১৯৬৫-২০২৫) পর্যালোচনা করলে দেখা যায়-কক্সবাজার ও মহেশখালী উপজেলাতে প্রায় ১৭-১৮টি বড় ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস আঘাত হেনে ছিল। ধারণা করা হয়, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের’ কারণে শুধুমাত্র বিশ্বব্যাপী মোট ‘ট্রপিক্যাল সাইক্লোনের’ সংখ্যাই বৃদ্ধি করছে না, বরং তীব্র ঝড়ের আধিক্য, অধিক সংখ্যায় ঘূর্ণিঘড়ের বা নিম্নচাপের সৃষ্টি এবং বৃষ্টিপাতের পরিমান বাড়াচ্ছে।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্যমতে, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- ‘মোখা’ (১৪ মে ২০২৩), ‘রেমাল’ (২৬ মে ২০২৪), ও ‘হামুন’ (২৪ অক্টোবর ২০২৪) এর কারণে মহেশখালী ও কক্সবাজারে প্রাণহানি, ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মহেশখালীর মতো উপকূলীয় এলাকাতে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু বসতভিটা বা অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিই করে না, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার উপরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একদিকে যেমন কৃষি-আবাদ, পশুপালন, মৎস চাষ প্রক্রিয়াতে প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য এলাকাতে সুপেয় পানির সংকট সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ী দ্বীপ মহেশখালীতে পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সাথে এই দ্বীপে নির্বাচারে পাহাড় কর্তন, বন উজাড় এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে সীমাহীন ভাবে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্রেকিং দা সাইলেন্স-BTS’ এর মতে, মহেশখালী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত একটি এলাকা, যেখানে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা, লবনাক্ত পানির জলাবদ্ধতা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এই দ্বীপের মানুষ, বিশেষ করে নারীরা কর্মসংস্থান ও জীবিকার অভাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বিভিন্ন এনজিওর গবেষণায় ও জরিপে দেখা গিয়েছে যে, প্রতি বছর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঝোড়ো বাতাসে কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, টেকনাফ ও মহেশখালীর হাজার হাজার বাড়ি ঘর বিদ্ধস্ত হয়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্থ হয় বেড়ি বাঁধ, কালভার্ট, ও রাস্তা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ২০২৩ এর অক্টোবরে সাইক্লোন ‘হামুন’র তাণ্ডবে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী, কুতুবদিয়া, উখিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া, ঈদগাঁও ও টেকনাফসহ ৭১টি ইউনিয়নে ৩৭ হাজার ৮৫৪টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সকল বাড়িঘর ও বসতভিটা, ল্যাট্রিন, নলকূপ ইত্যাদি মেরামতে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর বছরে বেশ কিছু অর্থ ব্যয় করতে হয়।
সরকারি হিসেবে, এই উপজেলাতে ব্যক্তিমালিকানাধীন বা খতিয়ান হিসেবে কৃষি ও বসতভিটার জমি খুব কমই রয়েছে। নিজস্ব কৃষি জমির সংকট থাকায়, উন্নয়ন কর্মকান্ডের জন্য সরকার কর্তৃক জমি অধিগ্রহনের কারণে স্থানীয়দের কৃষি পণ্যের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে দিন দিন। তাছাড়া পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে (অতি বৃষ্টি, খরা, উচ্চ তাপমাত্রা ইত্যাদি) ফসল চাষের ধরণ অমূলভাবে পাল্টে গিয়েছে-যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে স্থানীয় খাদ্যের সরবরাহ ও চাহিদার উপরে।
মহেশখালীর জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন ও সৃষ্ট সংকট মোকাবেলায় সরকারি-বেসরকারিভাবে নেয়া হয়েছে অনেক উদ্যোগ। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে সোনাদিয়া দ্বীপের ভূমি বন্দোবস্ত বাতিল করে জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করতে তা বন বিভাগের নিকট হস্তান্তর, প্যারাবন সৃষ্টি, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং পরিবেশ দূষণ মোকাবেলায় সামাজিক বনায়ন ও ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট্রেশনের মতো কার্যক্রম গ্রহণ করা। এছাড়া ‘মাতারবাড়ি’ তে মেগা প্রজেক্টের (কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্র বন্দর, এলএনজি টার্মিনাল) বাস্তবায়নের সময় পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে বেশ কিছু কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দুর্যোগের সময় জানমাল রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনে সহনশীল ও স্থিতিস্থাপক বসতি এবং জীবিকায়ন নিশ্চিতকরণের জন্য তেমন কোনো তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ নেয়া হয়নি বললেই চলে। তাছাড়া কৃষি, পশু-প্রাণিসম্পদ, মৎস, বন অধিদপ্তরের মাঝে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক উদ্যোগই কার্যকর হচ্ছে না।
বর্তমানে উপজেলাটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলা, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে টেকসই ও দুর্যোগ সহনশীল জীবন ও জীবিকায়ন নিশ্চিতে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF) ও গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ডের (GCF) অর্থায়নে বাস্তব ইনিসিয়েটিভ ফর পিপল’স সেলফ-ডেভেলপমেন্ট (www.bastob.org) ‘Resilient Homestead and Livelihood Support to the Vulnerable Coastal People of Bangladesh (RHL)’ নামে একটি ৫ বছর মেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে মে ২০২৪ হতে। ‘বাস্তব’ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রায় দরিদ্র ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ৩,৮০০ পরিবারের সাথে কাজ করছে তাদের অভিযোজিত ও টেকসই বসতভিটা ও জীবিকায়ন নিশ্চিতে। প্রকল্পের অধীনে অতি দরিদ্র ও দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে জলবায়ু সহনশীল ও স্থিতিস্থাপক উঁচু ঘর ও স্যানিটারি ল্যাট্রিন নির্মাণ করা দেয়া (সোলার প্যানেল ও বন্ধু চুলাসহ, যা দুর্যোগের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে), মাচাং পদ্ধতিতে ছাগল পালনের জন্য ঘর করে দেয়া, বসতভিটায় ও পতিত জমিতে সবজির চাষ, ঘোনায় রফতানি যোগ্য সফ্ট শেল ও হার্ড শেল কাঁকড়া চাষ, ঝোড়ো বাতাস প্রতিরোধী বৃক্ষরোপ, উপকূল অঞ্চল রক্ষায় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট্রেশন ও প্যারাবন সৃষ্টি, এবং স্থানীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মাঝে (এলাকাভিত্তিক ক্লাইমেট চেইঞ্জ এডাপটেশন গ্রূপের মাধ্যমে) জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনের সক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে-যা ইতিমধ্যে উপজেলাটিতে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় সরকার, উপজেলা প্রশাসন ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করা ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কারণে প্রকল্পটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আশা করা যায়, প্রকল্পটি সঠিকভাবে ও স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়ন হলে আগামী ২০২৯ সালের ভিতর মহেশখালীতে জলবায়ু অভিযোজনে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।
পরিশেষে বলা যেতে পারে, ‘মহেশখালী উপজেলা’ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তীব্র ঘূর্ণিঝড়, লোনা পানির অনুপ্রবেশ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা, ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে, যা এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইতিমধ্যে উপজেলার অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, অনেক মানুষ অন্যত্র কর্মসংস্থান বা জীবিকার প্রয়োজনে অভিবাসন করেছে। এছাড়া অনিশ্চিত জীবিকায়ন, ও কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে এই অঞ্চল ‘অনিরাপদ অভিবাসন বা মানব পাচারের’ উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। তাই এই ঝুঁকিগুলো মোকাবেলায় বিকল্প জীবিকায়ন যেমন-পরিবেশবান্ধব কৃষি, বিকল্প মৎস্য চাষ, কাঁকড়া-চিংড়ি চাষ, শুটকি প্রক্রিয়াকরণ, পান চাষ, পর্যটন, কুটিরশিল্প, ট্রেড ভিত্তিক কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি ও অন্যান্য টেকসই উপায়ে আয়ের উৎস সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষেরা জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে এবং স্থিতিশীল জীবনযাপন করতে পারে। শুধুমাত্র বৈদেশিক সাহায্য নির্ভর বা এনজিও’র প্রকল্পের উপরে নির্ভরশীল না হয়ে, সরকারি-বেসরকারি নতুন-নতুন উদ্যোগ নিতে হব। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে আসতে হবে জলবায়ু অভিযোজনযোগ্য কৃষি-মৎস-পশুপালন পদ্ধতির সম্প্রসারণ।
সহকারী পরিচালক (প্রোগ্রাম), বাস্তব
Email: aminul_haque2000@yahoo.com
MS (Envt. Science), PGD (Int. Relations)
Consultant (NGO Management)
Consultant (Migration & Development)













































