হাসপাতাল না নিলে মানুষ যাবে কোথায়?

জাকিয়া আহমেদ
 খুলনা মহানগরীর খালিশপুরের স্কুলছাত্র রিফাত লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। গত ৩১ মার্চ দুপুরে তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজসহ একে একে চারটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয়।কিন্তু চার প্রতিষ্ঠানের কোথাও ভর্তি হতে পেরে রিফাত সন্ধ্যায় মারা যায়। রিফাতের নানা কলিমুদ্দীন জানিয়েছেন, রিফাতকে মঙ্গলবার বেলা আড়াইটার দিকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক নেই বলে ভর্তি নেওয়া হয়নি, এরপর খালিশপুর ক্লিনিকে গেলে সেখানেও চিকিৎসক না থাকায় ভর্তি নেওয়া হয়নি। এরপর সার্জিক্যাল হাসপাতাল এবং পরে ময়লাপোতা হাসপাতালে রিফাতকে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু কিশোর রিফাতকে কোথাও ভর্তি নেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়, সন্ধ্যায় চিকিৎসার অভাবে সে মারা যায়।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার ১৬ বছরের সানজিদা ইসলাম সুমাইয়া সর্দি, কাশি ও জ্বরে ভুগছিল গত এক সপ্তাহ ধরে। ২৬ মার্চ তার শ্বাসকষ্ট হওয়াতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে চিকিৎসক ওষুধ দিয়ে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা বলেন। সেদিন সন্ধ্যাতেই অবস্থা গুরুতর হলে প্রথমে চট্টগ্রামের এক বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। সেখান থেকে সুমাইয়াকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য বলা হয়। কিন্তু, পরে তাকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহ করে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়। তবে রাতে সে হাসপাতালের সেবা বন্ধ থাকার কারণে শুক্রবার সকালে সুমাইয়াকে চট্টগ্রাম সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রেফারেন্স ছাড়া করোনাভাইরাসের টেস্ট করতে অস্বীকৃতি জানান। এত জটিলতার পর তার যে পরীক্ষা করা হয় তাতে দেখা গেছে, সুমাইয়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয়।

গণমাধ্যমে প্রতিদিন এভাবেই উঠে সংবাদ আসছে জ্বর-হাঁচি-কাশি- শ্বাসকষ্টের রোগীদের নিয়ে নানা বেদনাদায়ক খবর। এমন রোগীদের সহজেই ভর্তি নিচ্ছে না সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো। চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে আতঙ্কেই এসব রোগীকে ভর্তি নিতে চাইছে না হাসপাতালগুলো। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, একজন মুক্তিযোদ্ধা কে নিয়ে ১৬ ঘণ্টা ধরে ছয় হাসপাতালে ঘুরেছে এক অ্যাম্বুলেনন্স। কিন্তু, কোনও হাসপাতালে ঠাঁই না হওয়ায় শেষ অবধি ওই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই বিনা চিকিৎসায় মারা যান সেই মুক্তিযোদ্ধা।

এসবের পরিপ্রেক্ষিতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে কীনা সে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, হাসপাতাল, ডাক্তার সব থাকা সত্ত্বেও মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাবে, এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে সরকারি হাসপাতাল থেকে মানুষ ভর্তি হতে না পেরে মারা যাচ্ছে―এটা অবশ্যই একটি অ্যালার্মিং বিষয়।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি না নেওয়া বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোনও হাসপাতাল যদি কাউকে সন্দেহজনক মনে করে তখন সে হাসপাতাল থেকেই নমুনা সংগ্রহ করবে। যদি রোগী পজিটিভ হন তাহলে তাকে “করোনা হাসপাতালে” পাঠানো হবে, আর যদি না হয় তাহলে সেখানেই তাকে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে।

সাসপেক্টেড কিনা প্রথমেই বুঝবে কী করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাইন-সিম্পটম দেখে বুঝবে। দেখার পর যদি ঢাকায় হয় তো তারা ( সেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ) রোগীকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল অথবা শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে পাঠাবে। সেখানকার চিকিৎসকরা যদি মনে করেন তাকে ভর্তি নিতে হবে নেবে। যতক্ষণ না রোগীর পরীক্ষার ফলাফল না আসে, ততক্ষণ রোগীকে তারা সেখানে এমন সাবধানতার সঙ্গে রাখবে যেন এক রোগী থেকে আরেক রোগী সংক্রামিত না হয়।

কিন্তু সর্দি, কাশি দেখলেই হাসপাতালগুলো রোগী ফেরত দিচ্ছে, চিকিৎসা না পেয়ে রোগীরা মারা যাচ্ছেন এমন অভিযোগ জানালে তিনি বলেন, এখন থেকে নেবে- সে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার বাইরে কী ব্যবস্থা জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সেখানে কিছু হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড করা হয়েছে আমরা আরও সংখ্যা বাড়াচ্ছি।

বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রোগী ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এ বিষয়ে আপনাদের পক্ষ থেকে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ কিছু সাসপেক্ট করলে স্বাস্থ্য অধিদফতর, আইইডিসিআরসহ অন্যান্য হটলাইনগুলোতে কল করবে, আমরা প্রতিকার করবো। কিন্তু একটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে, তা হচ্ছে, এই মুহূর্তে চিকিৎসকদের শাস্তি দিয়ে যদি তাকে কাজ থেকে বিরত করা হয় তাহলে ডাক্তারের সংখ্যা কমে যাবে। কাজেই তাদের মোটিভেট করাটাই প্রধান অস্ত্র, তবে একদিনে এটা পরিবর্তন হবে তা নয়, সবাইকে সচেতন হতে হবে।

এদিকে, জানতে চাইলে চিকিৎসক নেতা অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাসপাতালগুলোতে আমরা কথা বলেছি। কোভিড-১৯ নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যেও ভীতি রয়েছে―এই জায়গাটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। দরকার তাদের নিজেদের সুরক্ষা। তবে এসব বিষয়ে নিয়ে যেসব বিভ্রান্তি রয়েছে সেগুলোও এখন দূর হবে।

এদিকে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চিকিৎসক-নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা যারা দিচ্ছেন তাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এ সমস্যার সমাধান হবে। একইসঙ্গে যারা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ রয়েছে তাদের উচিত হবে প্রতিটি সেকশনের সবার কাজ সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ করে দেওয়া। দরকার হলে যেসব হাসপাতালে টেস্ট হচ্ছে সেখানে পাঠাবে অথবা সেসব সেন্টার থেকে এসে স্যাম্পল