টাকা ছাপানোর পরামর্শ আত্মঘাতি

এ এম এম নাসির উদ্দিন

সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে যে দেশের করোনাজনিত অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবেলায় অর্থ সংস্হানের জন্যে বিভিন্ন মহল থেকে সরকারকে টাকা ছাপানোর পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।আজ দেখলাম এমন এক সংগঠনের পক্ষ হতে এ পরামর্শ এসেছে যাদের দাবি,আবদার বা পরামর্শ এর পক্ষে সমর্থন জানানোর জন্যে সরকারের অনেকে মুখিয়ে থাকেন। জানিনা যারা এ মুহুর্তে সরকারকে টাকা ছাপানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তাদের বক্তব্য যথাযথ তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি কিনা।যথাযথ গবেষণা লব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা বক্তব্য দিচ্ছেন কিনা তা অজানা।অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে যেটুকু বুঝি তাতে এ পর্যায়ে টাকা ছাপানো হলে দেশ মুদ্রাস্ফীতির করাল গ্রাসে পতিত হবার সমূহ সম্ভাবনা। মূদ্রাস্ফীতি সম্পর্কে অর্থনীতি শাস্ত্রের প্রাথমিক পাঠ হচ্ছে “Too much money chasing too few goods”. বাজারে পণ্য কম,টাকার সরবরাহ বেশি।ফলে দ্রব্যমূল্য হবে গগন চুম্বী। বর্তমানে কল কারখানা,ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ। উৎপাদন বন্ধ,সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রকৃত জি ডি পি সংকুচিত হচ্ছে ,মানুষের আয়,কর্মসংস্থানে ছেদ পড়েছে। এমতাবস্থায়,টাকা ছাপানোর সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতি।সাধারণ মানুষের উপর হবে ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’। করোনা এবং অর্থনীতির সংকট কতদিন চলবে কেউ জানিনা।

অর্থনীতিতে সংকট সবেমাত্র শুরু। এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে টাকা ছাপিয়ে কতদিন সামাল দেয়া যাবে? টাকা ছাপানো দোষের কিছু নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী একাজটি করে থাকে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় যথাযথ ডোজে মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে। তবে অর্থনীতিতে বিদ্যমান পরিস্হিতির মত সংকট মোকাবেলায় এমুহূর্তে টাকা ছাপানোর পরামর্শ আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। টাকা ছাপানো হচ্ছে এজাতীয় ক্ষেত্রে উপায়হীন হলে সর্বশেষ পদক্ষেপ। এখনও আমরা সে পর্যায়ে যাইনি। ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থামলে জার্মানী যুদ্ধ জয়ী দেশগুলো কে চুক্তি মোতাবেক ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। অর্থের সংস্হান করতে গিয়ে দেশটি দেদারছে টাকা ছাপাতে থাকে। মূল্যস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। কয়েকদিন পর পর দ্রব্যমুল্য দ্বিগুন হতে থাকে। জানা যায় জার্মানরা শীতে ঘর গরম করার জন্যে কাগজের টাকা পোড়ানোকে বেছে নেয় কারণ কাগজের টাকার চেয়ে লাকড়ির মূল্য বেশি ছিল।যুদ্ধের পূর্বে যে পাউরুটির দাম ছিল  ১৬০ মার্ক,সেটার দাম গিয়ে দাঁড়ায় কয়েকশ কোটি মার্ক এ।দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরে সংকট মোকাবেলায় টাকা ছাপানোর কারণে হাঙ্গেরীর অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও মারাত্বক আকার ধারন করেছিল।দৈনিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছিল সর্বোচ্চ দৈনিক ২০০℅। প্রতি পনের ঘন্টায় দ্রব্য মূল্য দ্বিগুন হচ্ছিল।অতি সম্প্রতি(২০০৭-২০০৯) জিম্বাবুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুগাবে অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে টাকা ছাপানোর ফলে অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে।মাসিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৭৯ বিলিয়নেরও বেশী।বর্তমানে সরকারের আয় ও মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।রপ্তানি আয়,কর আদায়,প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের প্রবাহ সব খাতেই ধারা প্রচন্ড নেতিবাচক।এর মধ্যেও সরকার বাজেটের বিভিন্ন খাত সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।সরকারকে সাধুবাদ দিতেই হয়।অর্থনীতিবিদরা করোনা পরবর্তী বিশ্বে এক মহা মন্দার আশংকা করছেন।এর সাথে মুলাস্ফীতি যোগ হলে অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে আসবে তা সামাল দেয়া হবে কঠিনতম। আমাদের অত্যন্ত দক্ষতার সাথে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে হবে।দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ গ্রুপ গঠন করে তাঁদের পরামর্শ নিয়েই আগাতে হবে।টাকা ছাপানোর পরামর্শ দেয়া এবং তা ছাপানো সহজ।কিন্তু এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া গভীর ভাবে বিবেচনা ও বিশ্লেষণ পূ্র্বক একাজে হাত দিতে হবে। আশা করব এ মুহূর্তে টাকা ছাপানোর ভূল পরামর্শ দিয়ে সরকারের উপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি থেকে সবাই বিরত থাকবেন।
লেখক: সাবেক সচিব