করোনা সন্দেহে জায়গা হয়নি হাসপাতালে, মৃত্যুর পর শ্যালকের আবেগঘন স্ট্যাটাস!

করোনা সন্দেহে জায়গা হয়নি হাসপাতালে, মৃত্যুর পর শ্যালকের আবেগঘন স্ট্যাটাস!

অনেকেই করোনা ভাইরাসের উপসর্গ সর্দি, কাশি, জ্বর কিংবা গলাব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে যাচ্ছেন। কিন্তু রোগীর লক্ষণ দেখার পর করোনা ভাইরাস সন্দেহে ওই রোগীতে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে না। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমন অভিযোগে এনে শ্বাসকষ্টে ভোগা নিজের পরিবারের একজন রোগীর মৃত্যুর খবর দিয়েছেন তারেক রিপন নামে এক ব্যক্তি।

গতকাল মঙ্গলবার ফেসবুক পেজে চিকিৎসার অভাবে নিজের বোন জামাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন তিনি। তারেক রিপনের স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

‘আমার বোন জামাই, আমার দুলাভাই। তিনি ব্যবসা করতেন চাঁদপুরে। ১০ দিন আগে উনার জ্বর এবং সাথে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। লোকাল ডাক্তার উনাকে ঢাকা নিয়ে যেতে বল্লো এবং সে দিনই তাকে ঢাকা নিয়ে আসা হলো। কিন্ত লোকাল ডাক্তার কোনো রোগের কথা বলেননি। পারিবারিকভাবে আমরা সচেতন বলে প্রথমেই উনাকে নিয়ে গেলাম কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। রাত তখন ৮টা। সেখানকার ডাক্তার উনার ফাইল দেখতে চাইলেন এবং তাদেরকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। ২ ঘণ্টা পর ডিউটি অফিসার ফিরে এসে জানালে আমরা এ রোগী এখানে রাখতে পারবো না কারন উনার নিউমোনিয়া লক্ষণ। বললেন বক্ষব্যধি হাসপাতালে নিয়ে যান। কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই তাদেরকে বের করে দেয়া হলো।

দুলাভাই তখনো খুব শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তারপর সেখান থেকে তাকে বক্ষব্যধিতে নেয়া হল কিন্ত করোনা রোগী বলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করলো না, বল্লো এধরনের রোগী তারা নিচ্ছেনা। সেখান থেকে নেয়া হলো ইবনে সিনা হাসপাতালে। তারা কোনো কথাই শুনলেন না। সেখান থেকে তাকে নেয়া হলো রেনেসাঁ নামে একটি ক্লিনিকে। সেখানও তারা গ্রহণ করলেন না। শুধুমাত্র শ্বাসকষ্ট শুনেই সবাই অপারগতার কথা বলে অনেকটা বের করে দিচ্ছে। রাত তখন ৪টা। সবাই হতাশ হয়ে উনাকে বাসায় নিয়ে গেলো। কোনো রকম রাত কাটানোর পর বাসায় একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার আর নেভ্যুলাইজারের ব্যবস্থা করা হলো। শ্বাসকষ্ট ব্যাপারটা কতোটা জটিল সেটা না বুঝলেও মোটমুটি সবাই কিন্তু কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারেন। যাই হোক ঘণ্টা তিনেক পর দুপুর ১টার দিকে একটা অ্যাম্বুলেন্সে কল করে উনাকে নিয়ে যাওয়া হলো ইউনাটেড হাসপাতালে। আমরা মূলত নিউমোনিয়া গোপন করে হার্টের সমস্যা বলে Appointment নিয়েছিলাম। না হলে হয়তো সেখানেও ঢুকতে পারতাম না। তারপর ডাক্তার উনার ফাইল দেখে বুঝতে পারলেন এবং করোনা ভাইরাস ধারণা করলেন। বললেন করোনা রিলেটেড হাসপাতালে চলে যেতে। ফলে সেখান থেকে বের হয়েই উনাকে নিয়ে যাওয়া হলো কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে। উনাকে রাখা হলো ২দিন। ৪৮ ঘণ্টা পর উনার রিপোর্ট আসলো নেগেটিভ, মানে তিনি করোনা ভাইরাস আক্রান্ত নন। তাকে রিলিজ দেয়া হলো।

এ অবস্থা আমাদের যার যার অবস্থান থাকে সকল ধরনের কার্ডিয়াক এবং নিউমোনিয়া রিলেটড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে মানবিক আবেদন করেও আমরা কারো মন গলাতে পারিনি। কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতাল থেকে আবারো নিয়ে যাওয়া হলো বাসায়। বিগত ৫ দিন তিনি কিন্ত বিন্দুমাত্র ঘুমাতে পারেনি। ইতিমধ্যে উনার হাত পা ফুলে গেছে, ডায়বেটিস চরম হাই, ফুসফুসে পানি জমে গেছে। ৭ দিনের মাথায় অনেককে দিয়ে তদবির করে ভর্তি করানে হলো হার্ট ইন্সটিটিউটটে। সেখানে নেই কোনো ডাক্তার। চরম আবহেল। যেখানে উনার দরকার তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, অক্সিজেন সেখানে চরম ডিলেডালা অবস্থা। নেই কোনো ডাক্তার। সবাই নাকি ছুটিতে।

২ দিন থাকার পর হঠাৎ ডাক্তার বললো আপনারা রিলিজ নিয়ে বাসায় চলে যান। এ চিকিৎসায় সময় লাগবে। তারচেয়ে বাসায় থাকা ভালো। আমরা অনেক বলেকয়েও আর হাসপাতালে থাকার অনুমতি পেলাম না। না জানলাম উনার কি সমস্যা না জানলাম উনার চিকিৎসা পদ্ধতি। বাসায় নিয়ে আসা হলো নবম দিনের মাথায়। একই দিন রাত ২টায় চরম শ্বাসকষ্ট শুরু হলো দুলাভাইয়ের। আবারও ব্যর্থ প্রচেষ্টার উদ্দেশ্যে অ্যাম্বুলেন্স কল করে হার্ট ইন্সটিটিউটের দিকে রওনা হলাম। সেখানে পৌঁছে জানলাম তিনি আর নেই। সবাইকে সকল ধরনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তার আর কোনও শ্বাসকষ্টও হচ্ছে না। তিনি মারা গেছেন। হ্যাঁ, ফাইনালি তিনি মারা গেছেন। এজন্য ফাইনালি বললাম, কারণ গত ১০ দিন মানসিকভাবে তিনি প্রতিদিনই মারা গেছেন।

একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুনতো আপনার বাবা-মা, ভাই-বোন বা সন্তান কেউ অসুস্থ আর আপনারা তাকে সাথে নিয়ে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল দৌড়ে বেড়াচ্ছেন অথচ কেউ আপনাদের ভর্তি করাচ্ছে না। তাহলে ঐ অসুস্থ মানুষটি কি জীবিত অবস্থায় মরে যাননি? আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো। যেকোনও হাসপাতাল আমরা Effort করতে পারতাম। কিন্ত কোনও হাসপাতালের বারান্দাতেইতো আমরা পৌঁছাতে পারলাম না। বলতে পারেন বিনা চিকিৎসায় একজন লোক মারা গেলো। আমার দুলাভাই এর যদি বিন্দুমাত্র চিকিৎসার নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারতাম তিনি মারা যেতেন না। তাহলে কি আর বলার বাকি রাখে, দেশের স্বাস্থ্যসেবা কতটা নাজুক। যেখানে কোনও চিকিৎসাই নেই সেখানে কার করোনা বা কার করোনা না কিভাবে বুঝবেন।

বাংলাদেশে যদি করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণেই থাকে তবে হাসপাতালগুলো কেন অন্য রোগের রোগী নেবে না। যদি হাসপাতালগুলো দেশের এ চরম দূর্যোগের সময় মানুষকে চিকিৎসা সেবা নাই দিতে পারে তবে তার লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না? এখন না হোক, পরিস্থিতি ভালো হলে কি এর বিচার আমরা পাবো? এতোগুলো হাসপাতালের বারান্দায় বারান্দায় গিয়েও যখন আমরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হলাম তখন কোন্ ধরনের উন্নয়নের গল্প আমাদের শুনাচ্ছেন? আমরা কোন্ উন্নয়নের পথ হাঁটছি?? এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর পরিবারের সদস্যকে সারাজীবনের জন্যে হারালো হয়তো কষ্টটা বুঝবেন কোনোদিন, যেটা কখনোই আমার কামনা না। আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুন। শুভকামনা সব সময়।’

ব্রেকিংনিউজ