করোনা পরীক্ষা নিয়ে সীমাহীন ভোগান্তি

দেশে করোনা সংক্রমণ দিন দিন বাড়ায় পরীক্ষার জন্য মানুষ ছুটছেন নির্ধারিত হাসপাতাল ও ল্যাবে। তবে সব হাসপাতাল ও ল্যাবে সব রোগীর নমুন নেয়া যাচ্ছে না। করোনার উপসর্গ আছে এমন রোগীরা এভাবে ছুটাছুটি করায় নতুন করে সংক্রমণ আরো বাড়ার ঝুঁকি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। রাত তখন ২টা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কিছু মানুষের আনাগোনা। রাজধানীসহ কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর থেকে এসেছেন কেউ কেউ । বেতার ভবনের ফিবার ক্লিনিকের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তারা। প্রাণঘাতি করোনা টেস্ট করাতে এসেছেন তারা।

কোনো না কোনো উপসর্গ রয়েছে প্রত্যেকেরই। কেউ কাশছেন। কেউ জ্বরে কাঁপছেন। গেইটে আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। বারবার সাবধান করে দিচ্ছেন, কাছে না যেতে। দূরত্ব বজায় রাখতে অনুরোধ করছেন তারা। এর মধ্যে শেষ রাতে নামে বৃষ্টি। বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে চেষ্টা করছিলেন সবাই। মেডিকেলের প্রধান ফটকের ভেতরে আশ্রয় পান তারা। ততক্ষণে কেউ কেউ ভিজে গেছেন। এভাবেই রাত থেকেই সংগ্রাম শুরু হয় করোনা টেস্টের জন্য। ভোর হতে হতে বাড়তে থাকে ভিড়। তখন সবাই ফটকের বাইরে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে  অপেক্ষা করেন একটি টোকেনের জন্য। টোকেন পেলেই চিকিৎসকের দেখা মিলবে। উপসর্গ বুঝেই সংগ্রহ করা হবে নমুনা। ততদূর পর্যন্ত যেতে পারেন না সবাই। নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়ে অনেককেই। সাধারণত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন সাড়ে ৩শ’ টোকেন দেয়া হয়। কিন্তু করোনা টেস্ট করাতে ভিড় করেন ছয় থেকে সাত শ’ মানুষ।
রাত ২টার থেকেই হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এখলাস ও সুমি দম্পতি। বৃষ্টিতে ভিজেছেন। অসুস্থ, ভেজা শরীর নিয়ে কাঁপছিলেন দু’জন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সকালে ৯টার দিকে টোকেন নিয়ে ভেতরে ঢুকেন। করোনার উপসর্গ থাকায় নমুনা রেখেছেন চিকিৎসকরা। এখালস ও সুমির বাড়ি মুন্সীগঞ্জ। থাকেন কেরানীগঞ্জে। কিছুদিন আগে এখলাসের মায়ের মৃত্যু হয়েছে। মায়ের শ্বাসকষ্ট ছিলো। করোনা টেস্ট করানোর আগেই মায়ের মৃত্যু হয়। তারপরই জ্বর, সর্দি ও কাশি দেখা দিয়েছে এই দম্পতির। করোনা টেস্ট করাতে গত মঙ্গলবার সকালে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তারা। কিন্তু লোকজন বেশি থাকায় শেষ পর্যন্ত টোকেন না পেয়ে অনেকের মতো ফিরে যেতে হয়েছে তাদের। তাই গতকাল রাত ২টার দিকেই এসে প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন।
এখলাস ও সুমি টেস্ট করাতে পারলেও নিরাশ হয়ে গতকাল ফিরে গেছেন ৫২ বছর বয়সী কবির আহমেদ। সকালে কথা হয় তার সঙ্গে। প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলেন। কোনো এক স্বজনকে জানাচ্ছিলেন, টেস্ট করাতে পারলাম না। আজ টোকেন শেষ। কথা বলছিলেন আর জ্বরে কাঁপছিলেন। মাঝে মধ্যে কাশছিলেনও তিনি।  মুখে মাস্ক। এক পর্যায়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে কথা হয় তার সঙ্গে। কবির আহমেদ জানান, কাফরুল থেকে এসেছেন তিনি। কচুক্ষেত এলাকায় একটি চালের দোকানে চাকরি করেন। থাকেন কাফরুলের একটি মেসে। বেশ কিছুদিন যাবত সর্দি, জ্বরে ভুগছেন। ওষুধে কাজ হচ্ছে না। কয়েকদিন যাবত গলা ব্যথাও হচ্ছে। সবমিলিয়ে তার ধারণা তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গতকাল সকাল ৮টার দিকে বিএসএমএমইউ’র বেতার ভবনের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। লাইনের সামনের সারির সবাই টোকেন পেলেও কবিরের পালা আসতেই নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, আর টোকেন নেই। টোকেন না পেয়েই কবিরসহ কয়েক শ’ মানুষকে ফিরে যেতে হয়েছে।
টোকেন না পেয়ে গেটের সামনে কাঁদছিলেন এক তরুণী ও তার মা। গাজীপুর থেকে অনেক কষ্টে সিএনজি অটোরিকশা করে এসেছেন। জানালেন, ওই তরুণী গার্মেন্টে চাকরি করেন। কয়েকদিন ধরেই জ্বরে আক্রান্ত। ভোরে এসেও টোকেন পাননি। আশায় ছিলেন একটা ব্যবস্থা হবে হয়তো। অনুনয় করছিলেন নিরাপত্তাকর্মীদের। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীরা এ বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করতে পারেননি। তারা জানিয়ে দেন সাড়ে তিন শ’ বেশি টোকেন দেয়ার সুযোগ নেই।  কারণ তার চেয়ে বেশি টেস্ট কীট নেই এই হাসপাতালে। মনিরা ও শিল্পী নামে দুই তরুণী জানান, গার্মেন্টে চাকরি করেন তারা। থাকেন মিরপুরে। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল। গার্মেন্টে কাজে যোগ দিতে পণ্যবাহী পিকআপে করে ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু বাসায় উঠতে দেয়নি বাড়ির মালিক। বাড়ির মালিক জানিয়েছেন, করোনা টেস্ট করে রিপোর্ট নিয়ে যেতে হবে। করোনা পজেটিভ হলে বাসায় উঠা যাবে না। রাত ১টার পর থেকেই হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন দুই তরুণী। টোকেনও মিলে। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাদের করোনার উপসর্গ নেই। বাসা সংক্রান্ত সমস্যার কথা জেনে একটি প্যাডে তা লিখে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন সাড়ে ৩শ’  রোগীর করোনা টেস্ট করার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিন সেখানে দুপুর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন ছয় জন চিকিৎসক। গতকাল সাড়ে ৩শ’ টোকেন দেয়া হয়। করোনা টেস্ট করা হয়েছে ৩২৩ জনকে। বাকিদের করোনা উপসর্গ না থাকায় টেস্ট করা হয়নি। শুরুতে টোকেন নিয়ে প্রধান ফটকের ভেতরে বাঁশ দিয়ে তৈরি সারিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক চিকিৎসকদের কাছে যেতে হয়। রোগীর বিবরণ শুনে প্রেসক্রিপশন দেয়া হয়। পরবর্তীতে নমুনা রাখেন টেকনেশিয়ানরা।
উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৩৩টি ল্যাবের মাধ্যমে এখন করোনার পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সুত্র – মানবজমিন